AahamVerseOriginals

Home of Horror, Mystery & Mythology

ads header

Friday, 23 January 2026

মৃত মৃত্তিকার ঘ্রাণ

ভয়... যখন রক্তে মেশে, তখন মানুষের পালস রেট বেড়ে যায়। চারপাশের চেনা পৃথিবীটা তখন অচেনা হয়ে ওঠে। শহুরে কোলাহল আর পিচঢালা রাস্তা যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই হয়তো শুরু হয় এক আদিম অন্ধকারের রাজত্ব। যেখানে মাটির রং লাল... আর প্রতিটা দীর্ঘশ্বাসে লুকিয়ে থাকে মৃত্যু।
অনির্বাণের বাইকের চাকা যখন হাইওয়ে ছেড়ে মোরাম বিছানো রাস্তায় পড়ল, সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গুগল ম্যাপের নীল রেখাটা দেখাচ্ছে গন্তব্য খুব বেশি দূরে নয়—‘শালবনী গ্রাম’। কিন্তু অনির্বাণের মনে হচ্ছিল, সে যেন সভ্যতার মানচিত্র থেকে ছিটকে কোনো ভিনগ্রহে এসে পড়েছে। বিকেলের আলো সাধারণত সোনালি হয়, কিন্তু এখানকার আকাশজুড়ে এক অদ্ভুত কালচে-তামাটে আভা।
রাস্তার ধারে একটা ছোট চায়ের দোকান। গ্রাম্য দোকান হলেও অদ্ভুত রকমের নির্জন। অনির্বাণ বাইকটা থামিয়ে হেলমেটটা খুলল।
"এই নিন দাদা, আদা দেওয়া স্পেশাল চা। আর কিছু দেব?"—দোকানদারের গলাটা বেশ স্বাভাবিক।
চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে অনির্বাণ পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতে জিজ্ঞেস করল, "না, ঠিক আছে। আচ্ছা দাদা, এখান থেকে শালবনী গ্রামটা আর কতদূর? ম্যাপে তো দেখাচ্ছে কাছেই..."
‘শালবনী’ নামটা শোনামাত্রই যেন অদৃশ্য কোনো সুইচ টিপে কেউ চারপাশের শব্দ স্তব্ধ করে দিল। চামচ নাড়তে থাকা দোকানদারের হাতটা থেমে গেল। সে মুখ তুলে তাকাল, কিন্তু সেই দৃষ্টিতে আর আতিথেয়তা নেই, আছে একরাশ ভয়।
গলার স্বর নামিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, "কোথায় যাবেন বললেন? শালবনী?"
অনির্বাণ অবাক হয়ে বলল, "হ্যাঁ। শালবনীর চৌধুরী বাড়ি। কেন? কোনো সমস্যা?"
দোকানদার এদিক-ওদিক তাকিয়ে যেন নিশ্চিত হয়ে নিতে চাইল কেউ শুনছে কি না। তারপর ঝুঁকে পড়ে বলল, "চা-টা খেয়ে ফিরে যান দাদা। সূর্য ডুবে গেলে ওই রাস্তায় যমও পা বাড়াতে ভয় পায়। ওই গ্রামের মাটি জ্যান্ত মানুষকে চেনে না..."
অনির্বাণ শহুরে যুক্তি দিয়ে ভাবল, গ্রাম্য কুসংস্কার। সে হেসে উড়িয়ে দিয়ে পকেট থেকে পয়সা বের করে টেবিলে রাখল। "ধুর মশাই! যত সব আজগুবি গল্প। চললাম।"
বাইকের ইঞ্জিনটা গর্জন করে উঠল। অনির্বাণ যখন ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, বাতাসের তোড়ে দোকানদারের শেষ চিৎকারটা তার কানে পৌঁছাল না—"বারণটা শুনলেন না বাবু! ওই পচা গন্ধে নাক দিলে আর ফিরতে পারবেন না..."
দোকানদারের কথাগুলো অনির্বাণের হেলমেটের কাচ ভেদ করে কানে না এলেও, শালবনীর বাতাসে মিশে থাকা একটা অস্বস্তি তাকে ছুঁয়ে গেল। পিচঢালা পথ শেষ হয়ে গেছে মাইল দুয়েক আগে। এখন চাকা গড়াচ্ছে লাল মাটির পথে। কিন্তু এ মাটি সাধারণ নয়। হেলমেটের কাচটা তুলতেই ভ্যাপসা গরম বাতাস ঝাপটা মারল মুখে। বাতাসের তাপের চেয়েও যেটা তাকে বেশি বিচলিত করল, সেটা হলো গন্ধটা।
শহরের ছেলে সে, ধুলো-ধোঁয়ার গন্ধ চেনে। কিন্তু এই গন্ধটা বড় অচেনা। না আছে সোঁদা মাটির ঘ্রাণ, না আছে মহুয়ার মাদকতা। তার বদলে নাকে আসছে একটা পচা... ভুরভুরে গন্ধ। যেন হাজার বছরের পুরনো কোনো কবর খুঁড়ে কেউ মাটি বের করে এনেছে। এ যেন মরে যাওয়া মাটির লাশ পচনের গন্ধ। অনির্বাণ বিরক্ত হয়ে রুমালে নাক চাপল। মাটি পচলেও কি এমন জঘন্য গন্ধ হয়?
বাইকটা আর বেশিদূর এগোল না। রাস্তাটা ক্রমশ সরু হয়ে ঝোপঝাড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে। অনির্বাণ বাইক রেখে হাঁটতে শুরু করল। দুপাশে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ, কিন্তু কোথাও কোনো ফসলের চিহ্ন নেই। মাইলের পর মাইল জুড়ে শুধু ছোট ছোট কাঁটাঝোপ। কাছে গিয়ে অনির্বাণ থমকে দাঁড়াল। গাছগুলোর পাতা হলুদ, কিন্তু শিরাগুলো দগদগে লাল। যেন কেউ সিরিঞ্জ দিয়ে গাছের শরীরে বিষাক্ত রক্ত পুশ করে দিয়েছে।
সামনেই একটা ভেঙে পড়া ইঁটের স্তূপ—হয়তো একসময় কোনো মানুষের আস্তানা ছিল। সেই ধ্বংসস্তূপের ছায়ায় বসে আছে একটি অবয়ব। মানুষ? না কি পাথরের মূর্তি? গায়ের চামড়া আর মেঠো রাস্তার ধুলোর রঙে কোনো তফাত নেই। মনে হচ্ছে যেন বহুকাল ধরে সে ওভাবেই বসে আছে... শ্যাওলা পড়া পাথরের মতো নিশ্চল।
হঠাৎ, সেই নিশ্চল পাথরে প্রাণের স্পন্দন জাগল।
"সূর্য ডোবার আগে পথ হারালেন নাকি বাবু?"—বৃদ্ধের গলার স্বর খুব শান্ত, নির্লিপ্ত, কিন্তু গভীর। তাতে কোনো আবেগের লেশমাত্র নেই।
অনির্বাণ চমকে ওঠেনি, কিন্তু একটা হিমশীতল স্রোত তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। বৃদ্ধের চোখদুটো ঘোলাটে, যেন মরা মাছের চোখ। সেখানে দৃষ্টি আছে, কিন্তু দ্যুতি নেই।
একটু গলা ঝেড়ে অনির্বাণ বলল, "না... মানে, পথ হারাইনি। আমি শালবনী গ্রামের চৌধুরী বাড়িতে যাব। ম্যাপে দেখলাম রাস্তাটা এখানেই শেষ।"
বৃদ্ধের ঠোঁটের কোণে একটা শুকনো হাসি ফুটে উঠল। যেন গলায় বালি আটকে আছে এমন স্বরে সে বলল, "চৌধুরী বাড়ি? হেঃ... ম্যাপে কি আর সব জায়গার হদিস থাকে বাবু? কিছু কিছু জায়গা পৃথিবীর মাটি থেকে মুছে যায়, শুধু মানুষের লোভে বেঁচে থাকে।"
অনির্বাণ ভুরু কুঁচকে তাকাল। "তার মানে? বাড়িটা কি ভেঙে গেছে?"
বৃদ্ধ হাতের লাঠি দিয়ে মাটিতে একটা দাগ কাটতে কাটতে বলল, "বাড়ি ভাঙলে তো ভালোই হতো বাবু। কিন্তু মাটি যদি বাড়িকে গিলে খায়? এই মাটি দেখছেন না? এ মাটি মরে গেছে। মৃত জিনিসের পেটে খিদে বড় বেশি।"
অনির্বাণের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছিল। একে এই বিদঘুটে গন্ধ, তার ওপর এই পাগলাটে বৃদ্ধের হেঁয়ালি। সে বিরক্ত হয়ে বলল, "আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না। আর এই গন্ধটা... কিসের গন্ধ এটা?"
বৃদ্ধ এবার চোখ তুলে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে এমন এক ঠান্ডা ভাব ছিল যা বিকেলের ভ্যাপসা গরমেও অনির্বাণকে কাঁপিয়ে দিল।
"গন্ধ? ওটা মাটির দীর্ঘশ্বাস বাবু। জ্যান্ত মানুষ যেমন দম আটকে গেলে ছটফট করে, এ মাটিও তেমন ছটফট করছে। শ্বাস নিতে পারছে না। তাই ভেতর থেকে পচা ভাপ বেরোচ্ছে। ফিরে যান। অন্ধকার নামলে এই বাতাস আর নিঃশ্বাস নেওয়ার যোগ্য থাকে না।"
কথাগুলো বলতে বলতে বৃদ্ধের গলাটা কেমন যেন যান্ত্রিক হয়ে গেল। অনির্বাণ যুক্তিবাদী মানুষ। কিন্তু এই নির্জন প্রান্তরে, এই অদ্ভুত দর্শন বৃদ্ধের মুখে ‘মাটির দীর্ঘশ্বাস’-এর কথা শুনে তার বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। তবু, সে অনেক দূর থেকে এসেছে। এভাবে ফিরে যাওয়া যায় না।
নিজেকে জোর করে সাহস জুগিয়ে অনির্বাণ বলল, "ভয় দেখাচ্ছেন কেন দাদু? আমি ফিরে যাওয়ার জন্য আসিনি। আমাকে যেতেই হবে।"
বৃদ্ধ আবার মাটির দিকে তাকাল। তার গলায় ঝরে পড়ল এক অমোঘ সত্য, "যেতে তো সবাই চায় বাবু... কিন্তু ফিরতে কজন পারে? যান... এগিয়ে যান। মাটি তো আপ্যায়ন করার জন্য মুখিয়েই আছে।"
বৃদ্ধ আর কোনো কথা বলল না। আবার সেই পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে গেল।
অনির্বাণ আর দাঁড়াল না। সে আবার হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু লাল মাটির পথটা যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। আর যতই সে এগোচ্ছে, সেই পচা গন্ধটা ততই তীব্র হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন বাতাসটা ভারী হয়ে চেপে বসছে তার ফুসফুসের ওপর।
হঠাৎ... পায়ের নিচের মাটিটা কি কেঁপে উঠল?
ভূমিকম্প নয়। অনির্বাণ থমকে দাঁড়িয়ে নিচু হয়ে দেখল। মাটির নিচ থেকে সরু সরু লালচে শিকড় বেরিয়ে আসছে... যেন অজস্র সাপের মতো কিলবিল করে নড়ছে সেগুলো। তারা যেন মাটির নিচ থেকে কিছু একটা খুঁজছে... বা কাউকে খুঁজছে।
"শিকড়গুলো... জ্যান্ত?" অনির্বাণের গলা দিয়ে আতঙ্কের স্বর বেরলো।
সে চোখ রগড়ে আবার তাকাল। শিকড়গুলো স্থির। চোখের ভুল? হয়তো। কিন্তু সেই জঘন্য গন্ধটা এখন অসহ্য। সামনে গ্রাম দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কোনো মানুষের সাড়া নেই। নেই কোনো সন্ধ্যাকালীন প্রদীপ। শুধু দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি পোড়োজমি আর সেই অভিশপ্ত লাল ফুলের জঙ্গল।
বাতাসে ভেসে এল এক অদ্ভুত শব্দ। অনেকটা শেয়ালের ডাকের মতো, কিন্তু তার সাথে মিশে আছে মানুষের হাহাকার... কিংবা কোনো অশরীরী অট্টহাসি। অনির্বাণ বুঝতে পারল, বৃদ্ধ ভুল বলেনি। এখানে শুধু মাটি মরেনি... এই মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে এমন কিছু অতীত... যা জাগাতে নেই।
শালবনীর মাটিতে পা তো দেওয়া হলো... কিন্তু ফেরা কি হবে? চৌধুরী বাড়ির সেই কঙ্কালসার অতীতে কী লুকিয়ে আছে? সেই উত্তর খুঁজতে অনির্বাণ পা বাড়াল অন্ধকারের দিকে।
(ক্রমশ)


No comments:

Post a Comment

Search This Blog

Powered by Blogger.