চৌধুরী বাড়ির লোহার গেটটা এককালে নিশ্চয়ই রাজকীয় ছিল। এখন সেটা কেবল মরিচা ধরা কঙ্কাল। একদিকের পাল্লাটা হেলে পড়েছে, যেন ভার সইতে না পেরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে সময়ের কাছে। অনির্বাণ জং ধরা গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। একটা তীক্ষ্ণ ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দ নিস্তব্ধতাকে চিরে দিল।
বাড়িটার সামনে একসময় হয়তো বাগান ছিল, এখন সেটা আগাছার জঙ্গল। সেই অদ্ভুত লাল ফুলের ঝোপ এখানেও রাজত্ব করছে। বাড়িটা দোতলা, ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্য। থামগুলো শেওলা পড়ে কালচে হয়ে গেছে। দেওয়ালের পলেস্তারা খসে বেরিয়ে পড়েছে ইটের পাঁজর।
অনির্বাণ টর্চটা জ্বালল। বিকেলের আলো নিভে গিয়ে এখন প্রায় সন্ধ্যা। সদর দরজাটা বিশাল কাঠের তৈরি। আশ্চর্য বিষয় হলো, দরজাটা খোলা। যেন কেউ তার আসার অপেক্ষাতেই ছিল।
ভেতরে পা রাখতেই এক ভ্যাপসা গন্ধ তাকে স্বাগত জানাল। বাইরের সেই পচা মাটির গন্ধের সঙ্গে এখানে মিশেছে পুরনো কাঠ আর ধুলোর গন্ধ। টর্চের আলো ফেলে সে দেখল, বিশাল একটা হলঘর। মাঝে একটা ঝাড়লন্ঠন ঝুলছে, যার কাচগুলো মাকড়সার জালে ঢাকা। একপাশে সোফা সেট, যার গদিগুলো ইঁদুরে কেটে ছারখার করে দিয়েছে।
"কেউ আছেন?" অনির্বাণ ডাক দিল।
তার নিজের গলার স্বরই প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল— আছেন... আছেন...
উত্তর এল না।
অনির্বাণ জানে, এই বাড়িতে গত দশ বছর কেউ থাকে না। কিন্তু তার ক্লায়েন্ট, মিস্টার সোম, তাকে বলেছিলেন বাড়ির দলিলের কাগজপত্র সব লাইব্রেরি ঘরে রাখা আছে। তাকে সেগুলো উদ্ধার করতে হবে।
সে সাবধানে পা ফেলে এগোতে লাগল। মেঝের তলায় কাঠের পাটাতন। সেগুন কাঠের ভারী তক্তা দিয়ে মোড়া মেঝে। অনির্বাণ বুট জুতো পরে হাঁটছে, প্রতিটি পদক্ষেপে কাঠের মেঝে মচমচ করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল।
শব্দটা খুব ক্ষীণ, কিন্তু স্পষ্ট।
খস... খস... খস...
ইঁদুর হবে হয়তো। পুরনো বাড়িতে ইঁদুর থাকাটাই স্বাভাবিক। অনির্বাণ নিজেকে বোঝাল। কিন্তু শব্দটা ঠিক ইঁদুরের দৌড়াদৌড়ির মতো নয়। শব্দটা আসছে তার ঠিক পায়ের নিচ থেকে। যেন মেঝের তলায় ভারী কিছু একটা ঘঁষে ঘঁষে চলছে।
সে হাঁটু গেড়ে বসল। টর্চের আলোটা মেঝের ওপর ফেলল। কাঠের তক্তাগুলোর ফাঁক দিয়ে ধুলো জমা অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সে কান পাতল।
শব্দটা একটানা হয়েই চলেছে। মনে হচ্ছে, কাঠের নিচেই কেউ শ্বাস নিচ্ছে। একটা ভারী, কষ্টকর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। আর তার সঙ্গে সেই বিশ্রী পচা গন্ধটা যেন তক্তা ভেদ করে উঠে আসছে।
অনির্বাণের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। সে পকেট থেকে তার সুইস নাইফটা বের করল। একটা তক্তা সামান্য আলগা হয়ে আছে। সে নাইফের ফলাটা ফাঁকফোকরে ঢুকিয়ে একটু চাপ দিল। পুরনো কাঠ, সহজেই মড়মড় করে উঠে এল তক্তাটা।
টর্চের আলোটা সেই গর্তের মধ্যে ফেলতেই অনির্বাণের হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
সে আশা করেছিল ইঁদুর, সাপ বা নিদেনপক্ষে ফাঁকা অন্ধকার দেখবে। কিন্তু সে যা দেখল, তা জীববিজ্ঞানের কোনো নিয়মে পড়ে না।
মেঝের তলায়, মাটির সমান্তরালে ছড়িয়ে আছে অজস্র শিকড়। কিন্তু সেগুলো গাছের সাধারণ বাদামী বা মেটে রঙের শিকড় নয়। সেগুলো দেখতে মাংসল, শিরা-উপশিরায় ভরা এবং গাঢ় লাল রঙের। ঠিক যেন মানুষের শরীরের ভেতরকার ধমনী। আর সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো—শিকড়গুলো স্থির নয়।
অনির্বাণ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে দেখল, শিকড়গুলো খুব ধীর লয়ে স্পন্দিত হচ্ছে। ঢিপ... ঢিপ... ঢিপ... যেন বিশাল কোনো দানবীয় হৃদপিণ্ড মাটির গভীরে পাম্প করছে, আর এই শিকড়গুলো দিয়ে সারা বাড়িতে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিষাক্ত রক্ত।
তক্তা সরানোর ফলে বাইরের বাতাস লাগতেই শিকড়গুলো যেন সচকিত হয়ে উঠল। একটা সরু লাল শিকড় সাপের ফণার মতো একটু কুঁকড়ে গেল, তারপর আবার সোজা হয়ে মাটির গভীরে সেঁধিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।
অনির্বাণ ছিটকে সরে এল সেখান থেকে। হাত থেকে টর্চটা পড়ে গিয়ে মেঝের ওপর গড়াগড়ি খেল। আলো-আঁধারিতে মনে হলো, সারা ঘরের মেঝেই যেন কাঁপছে। দেয়ালের কোণগুলো, সিঁড়ির ধাপগুলো—সবকিছুর নিচেই কি তবে এই জীবন্ত জালের বিস্তার?
বৃদ্ধের কথাটা তার কানে বাজল— "ওগুলো মাটির রক্ত শুষে বড় হচ্ছে।"
অনির্বাণ দ্রুত আলগা তক্তাটা আবার জায়গামতো বসিয়ে দিল। যেন এই দৃশ্য না দেখলেই সত্যটা মিথ্যা হয়ে যাবে। সে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু তার পা টলছে। এই নির্জন প্রাসাদে সে একা নয়। তার পায়ের নিচেই জেগে আছে এক অজানা অস্তিত্ব, যা কেবল মাটির নিচে থাকার কথা ছিল, কিন্তু এখন তা মানুষের বাসস্থানে হানা দিয়েছে।
হঠাৎ ওপরতলা থেকে একটা শব্দ এল। ধপাস করে কিছু একটা পড়ার শব্দ।
অনির্বাণ চমকে ওপরের দিকে তাকাল। দোতলার সিঁড়িটা অন্ধকারের মধ্যে হা করে আছে। শিকড়গুলো কি তবে দোতলাতেও পৌঁছে গেছে? নাকি সেখানে অন্য কেউ আছে?
ভয় আর কৌতূহল—দুটোই তাকে গ্রাস করল। সে টর্চটা তুলে নিল মাটি থেকে। আলোটা কাঁপা কাঁপা হাতে সিঁড়ির দিকে তাক করল। তাকে ওপরে যেতে হবে। রহস্যের শুরু যদি মাটির নিচে হয়, তবে তার শেষ কোথায়, তা তাকে জানতেই হবে।