AahamVerseOriginals

Home of Horror, Mystery & Mythology

ads header

Friday, 23 January 2026

মেঝের তলায় শিকড়

চৌধুরী বাড়ির লোহার গেটটা এককালে নিশ্চয়ই রাজকীয় ছিল। এখন সেটা কেবল মরিচা ধরা কঙ্কাল। একদিকের পাল্লাটা হেলে পড়েছে, যেন ভার সইতে না পেরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে সময়ের কাছে। অনির্বাণ জং ধরা গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। একটা তীক্ষ্ণ ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দ নিস্তব্ধতাকে চিরে দিল।
বাড়িটার সামনে একসময় হয়তো বাগান ছিল, এখন সেটা আগাছার জঙ্গল। সেই অদ্ভুত লাল ফুলের ঝোপ এখানেও রাজত্ব করছে। বাড়িটা দোতলা, ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্য। থামগুলো শেওলা পড়ে কালচে হয়ে গেছে। দেওয়ালের পলেস্তারা খসে বেরিয়ে পড়েছে ইটের পাঁজর।
অনির্বাণ টর্চটা জ্বালল। বিকেলের আলো নিভে গিয়ে এখন প্রায় সন্ধ্যা। সদর দরজাটা বিশাল কাঠের তৈরি। আশ্চর্য বিষয় হলো, দরজাটা খোলা। যেন কেউ তার আসার অপেক্ষাতেই ছিল।
ভেতরে পা রাখতেই এক ভ্যাপসা গন্ধ তাকে স্বাগত জানাল। বাইরের সেই পচা মাটির গন্ধের সঙ্গে এখানে মিশেছে পুরনো কাঠ আর ধুলোর গন্ধ। টর্চের আলো ফেলে সে দেখল, বিশাল একটা হলঘর। মাঝে একটা ঝাড়লন্ঠন ঝুলছে, যার কাচগুলো মাকড়সার জালে ঢাকা। একপাশে সোফা সেট, যার গদিগুলো ইঁদুরে কেটে ছারখার করে দিয়েছে।
"কেউ আছেন?" অনির্বাণ ডাক দিল।
তার নিজের গলার স্বরই প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল— আছেন... আছেন...
উত্তর এল না।
অনির্বাণ জানে, এই বাড়িতে গত দশ বছর কেউ থাকে না। কিন্তু তার ক্লায়েন্ট, মিস্টার সোম, তাকে বলেছিলেন বাড়ির দলিলের কাগজপত্র সব লাইব্রেরি ঘরে রাখা আছে। তাকে সেগুলো উদ্ধার করতে হবে।
সে সাবধানে পা ফেলে এগোতে লাগল। মেঝের তলায় কাঠের পাটাতন। সেগুন কাঠের ভারী তক্তা দিয়ে মোড়া মেঝে। অনির্বাণ বুট জুতো পরে হাঁটছে, প্রতিটি পদক্ষেপে কাঠের মেঝে মচমচ করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল।
শব্দটা খুব ক্ষীণ, কিন্তু স্পষ্ট।
খস... খস... খস...
ইঁদুর হবে হয়তো। পুরনো বাড়িতে ইঁদুর থাকাটাই স্বাভাবিক। অনির্বাণ নিজেকে বোঝাল। কিন্তু শব্দটা ঠিক ইঁদুরের দৌড়াদৌড়ির মতো নয়। শব্দটা আসছে তার ঠিক পায়ের নিচ থেকে। যেন মেঝের তলায় ভারী কিছু একটা ঘঁষে ঘঁষে চলছে।
সে হাঁটু গেড়ে বসল। টর্চের আলোটা মেঝের ওপর ফেলল। কাঠের তক্তাগুলোর ফাঁক দিয়ে ধুলো জমা অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সে কান পাতল।
শব্দটা একটানা হয়েই চলেছে। মনে হচ্ছে, কাঠের নিচেই কেউ শ্বাস নিচ্ছে। একটা ভারী, কষ্টকর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। আর তার সঙ্গে সেই বিশ্রী পচা গন্ধটা যেন তক্তা ভেদ করে উঠে আসছে।
অনির্বাণের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। সে পকেট থেকে তার সুইস নাইফটা বের করল। একটা তক্তা সামান্য আলগা হয়ে আছে। সে নাইফের ফলাটা ফাঁকফোকরে ঢুকিয়ে একটু চাপ দিল। পুরনো কাঠ, সহজেই মড়মড় করে উঠে এল তক্তাটা।
টর্চের আলোটা সেই গর্তের মধ্যে ফেলতেই অনির্বাণের হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
সে আশা করেছিল ইঁদুর, সাপ বা নিদেনপক্ষে ফাঁকা অন্ধকার দেখবে। কিন্তু সে যা দেখল, তা জীববিজ্ঞানের কোনো নিয়মে পড়ে না।
মেঝের তলায়, মাটির সমান্তরালে ছড়িয়ে আছে অজস্র শিকড়। কিন্তু সেগুলো গাছের সাধারণ বাদামী বা মেটে রঙের শিকড় নয়। সেগুলো দেখতে মাংসল, শিরা-উপশিরায় ভরা এবং গাঢ় লাল রঙের। ঠিক যেন মানুষের শরীরের ভেতরকার ধমনী। আর সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো—শিকড়গুলো স্থির নয়।
অনির্বাণ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে দেখল, শিকড়গুলো খুব ধীর লয়ে স্পন্দিত হচ্ছে। ঢিপ... ঢিপ... ঢিপ... যেন বিশাল কোনো দানবীয় হৃদপিণ্ড মাটির গভীরে পাম্প করছে, আর এই শিকড়গুলো দিয়ে সারা বাড়িতে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিষাক্ত রক্ত।
তক্তা সরানোর ফলে বাইরের বাতাস লাগতেই শিকড়গুলো যেন সচকিত হয়ে উঠল। একটা সরু লাল শিকড় সাপের ফণার মতো একটু কুঁকড়ে গেল, তারপর আবার সোজা হয়ে মাটির গভীরে সেঁধিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।
অনির্বাণ ছিটকে সরে এল সেখান থেকে। হাত থেকে টর্চটা পড়ে গিয়ে মেঝের ওপর গড়াগড়ি খেল। আলো-আঁধারিতে মনে হলো, সারা ঘরের মেঝেই যেন কাঁপছে। দেয়ালের কোণগুলো, সিঁড়ির ধাপগুলো—সবকিছুর নিচেই কি তবে এই জীবন্ত জালের বিস্তার?
বৃদ্ধের কথাটা তার কানে বাজল— "ওগুলো মাটির রক্ত শুষে বড় হচ্ছে।"
অনির্বাণ দ্রুত আলগা তক্তাটা আবার জায়গামতো বসিয়ে দিল। যেন এই দৃশ্য না দেখলেই সত্যটা মিথ্যা হয়ে যাবে। সে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু তার পা টলছে। এই নির্জন প্রাসাদে সে একা নয়। তার পায়ের নিচেই জেগে আছে এক অজানা অস্তিত্ব, যা কেবল মাটির নিচে থাকার কথা ছিল, কিন্তু এখন তা মানুষের বাসস্থানে হানা দিয়েছে।
হঠাৎ ওপরতলা থেকে একটা শব্দ এল। ধপাস করে কিছু একটা পড়ার শব্দ।
অনির্বাণ চমকে ওপরের দিকে তাকাল। দোতলার সিঁড়িটা অন্ধকারের মধ্যে হা করে আছে। শিকড়গুলো কি তবে দোতলাতেও পৌঁছে গেছে? নাকি সেখানে অন্য কেউ আছে?
ভয় আর কৌতূহল—দুটোই তাকে গ্রাস করল। সে টর্চটা তুলে নিল মাটি থেকে। আলোটা কাঁপা কাঁপা হাতে সিঁড়ির দিকে তাক করল। তাকে ওপরে যেতে হবে। রহস্যের শুরু যদি মাটির নিচে হয়, তবে তার শেষ কোথায়, তা তাকে জানতেই হবে।


মৃত মৃত্তিকার ঘ্রাণ

ভয়... যখন রক্তে মেশে, তখন মানুষের পালস রেট বেড়ে যায়। চারপাশের চেনা পৃথিবীটা তখন অচেনা হয়ে ওঠে। শহুরে কোলাহল আর পিচঢালা রাস্তা যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই হয়তো শুরু হয় এক আদিম অন্ধকারের রাজত্ব। যেখানে মাটির রং লাল... আর প্রতিটা দীর্ঘশ্বাসে লুকিয়ে থাকে মৃত্যু।
অনির্বাণের বাইকের চাকা যখন হাইওয়ে ছেড়ে মোরাম বিছানো রাস্তায় পড়ল, সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গুগল ম্যাপের নীল রেখাটা দেখাচ্ছে গন্তব্য খুব বেশি দূরে নয়—‘শালবনী গ্রাম’। কিন্তু অনির্বাণের মনে হচ্ছিল, সে যেন সভ্যতার মানচিত্র থেকে ছিটকে কোনো ভিনগ্রহে এসে পড়েছে। বিকেলের আলো সাধারণত সোনালি হয়, কিন্তু এখানকার আকাশজুড়ে এক অদ্ভুত কালচে-তামাটে আভা।
রাস্তার ধারে একটা ছোট চায়ের দোকান। গ্রাম্য দোকান হলেও অদ্ভুত রকমের নির্জন। অনির্বাণ বাইকটা থামিয়ে হেলমেটটা খুলল।
"এই নিন দাদা, আদা দেওয়া স্পেশাল চা। আর কিছু দেব?"—দোকানদারের গলাটা বেশ স্বাভাবিক।
চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে অনির্বাণ পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতে জিজ্ঞেস করল, "না, ঠিক আছে। আচ্ছা দাদা, এখান থেকে শালবনী গ্রামটা আর কতদূর? ম্যাপে তো দেখাচ্ছে কাছেই..."
‘শালবনী’ নামটা শোনামাত্রই যেন অদৃশ্য কোনো সুইচ টিপে কেউ চারপাশের শব্দ স্তব্ধ করে দিল। চামচ নাড়তে থাকা দোকানদারের হাতটা থেমে গেল। সে মুখ তুলে তাকাল, কিন্তু সেই দৃষ্টিতে আর আতিথেয়তা নেই, আছে একরাশ ভয়।
গলার স্বর নামিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, "কোথায় যাবেন বললেন? শালবনী?"
অনির্বাণ অবাক হয়ে বলল, "হ্যাঁ। শালবনীর চৌধুরী বাড়ি। কেন? কোনো সমস্যা?"
দোকানদার এদিক-ওদিক তাকিয়ে যেন নিশ্চিত হয়ে নিতে চাইল কেউ শুনছে কি না। তারপর ঝুঁকে পড়ে বলল, "চা-টা খেয়ে ফিরে যান দাদা। সূর্য ডুবে গেলে ওই রাস্তায় যমও পা বাড়াতে ভয় পায়। ওই গ্রামের মাটি জ্যান্ত মানুষকে চেনে না..."
অনির্বাণ শহুরে যুক্তি দিয়ে ভাবল, গ্রাম্য কুসংস্কার। সে হেসে উড়িয়ে দিয়ে পকেট থেকে পয়সা বের করে টেবিলে রাখল। "ধুর মশাই! যত সব আজগুবি গল্প। চললাম।"
বাইকের ইঞ্জিনটা গর্জন করে উঠল। অনির্বাণ যখন ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, বাতাসের তোড়ে দোকানদারের শেষ চিৎকারটা তার কানে পৌঁছাল না—"বারণটা শুনলেন না বাবু! ওই পচা গন্ধে নাক দিলে আর ফিরতে পারবেন না..."
দোকানদারের কথাগুলো অনির্বাণের হেলমেটের কাচ ভেদ করে কানে না এলেও, শালবনীর বাতাসে মিশে থাকা একটা অস্বস্তি তাকে ছুঁয়ে গেল। পিচঢালা পথ শেষ হয়ে গেছে মাইল দুয়েক আগে। এখন চাকা গড়াচ্ছে লাল মাটির পথে। কিন্তু এ মাটি সাধারণ নয়। হেলমেটের কাচটা তুলতেই ভ্যাপসা গরম বাতাস ঝাপটা মারল মুখে। বাতাসের তাপের চেয়েও যেটা তাকে বেশি বিচলিত করল, সেটা হলো গন্ধটা।
শহরের ছেলে সে, ধুলো-ধোঁয়ার গন্ধ চেনে। কিন্তু এই গন্ধটা বড় অচেনা। না আছে সোঁদা মাটির ঘ্রাণ, না আছে মহুয়ার মাদকতা। তার বদলে নাকে আসছে একটা পচা... ভুরভুরে গন্ধ। যেন হাজার বছরের পুরনো কোনো কবর খুঁড়ে কেউ মাটি বের করে এনেছে। এ যেন মরে যাওয়া মাটির লাশ পচনের গন্ধ। অনির্বাণ বিরক্ত হয়ে রুমালে নাক চাপল। মাটি পচলেও কি এমন জঘন্য গন্ধ হয়?
বাইকটা আর বেশিদূর এগোল না। রাস্তাটা ক্রমশ সরু হয়ে ঝোপঝাড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে। অনির্বাণ বাইক রেখে হাঁটতে শুরু করল। দুপাশে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ, কিন্তু কোথাও কোনো ফসলের চিহ্ন নেই। মাইলের পর মাইল জুড়ে শুধু ছোট ছোট কাঁটাঝোপ। কাছে গিয়ে অনির্বাণ থমকে দাঁড়াল। গাছগুলোর পাতা হলুদ, কিন্তু শিরাগুলো দগদগে লাল। যেন কেউ সিরিঞ্জ দিয়ে গাছের শরীরে বিষাক্ত রক্ত পুশ করে দিয়েছে।
সামনেই একটা ভেঙে পড়া ইঁটের স্তূপ—হয়তো একসময় কোনো মানুষের আস্তানা ছিল। সেই ধ্বংসস্তূপের ছায়ায় বসে আছে একটি অবয়ব। মানুষ? না কি পাথরের মূর্তি? গায়ের চামড়া আর মেঠো রাস্তার ধুলোর রঙে কোনো তফাত নেই। মনে হচ্ছে যেন বহুকাল ধরে সে ওভাবেই বসে আছে... শ্যাওলা পড়া পাথরের মতো নিশ্চল।
হঠাৎ, সেই নিশ্চল পাথরে প্রাণের স্পন্দন জাগল।
"সূর্য ডোবার আগে পথ হারালেন নাকি বাবু?"—বৃদ্ধের গলার স্বর খুব শান্ত, নির্লিপ্ত, কিন্তু গভীর। তাতে কোনো আবেগের লেশমাত্র নেই।
অনির্বাণ চমকে ওঠেনি, কিন্তু একটা হিমশীতল স্রোত তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। বৃদ্ধের চোখদুটো ঘোলাটে, যেন মরা মাছের চোখ। সেখানে দৃষ্টি আছে, কিন্তু দ্যুতি নেই।
একটু গলা ঝেড়ে অনির্বাণ বলল, "না... মানে, পথ হারাইনি। আমি শালবনী গ্রামের চৌধুরী বাড়িতে যাব। ম্যাপে দেখলাম রাস্তাটা এখানেই শেষ।"
বৃদ্ধের ঠোঁটের কোণে একটা শুকনো হাসি ফুটে উঠল। যেন গলায় বালি আটকে আছে এমন স্বরে সে বলল, "চৌধুরী বাড়ি? হেঃ... ম্যাপে কি আর সব জায়গার হদিস থাকে বাবু? কিছু কিছু জায়গা পৃথিবীর মাটি থেকে মুছে যায়, শুধু মানুষের লোভে বেঁচে থাকে।"
অনির্বাণ ভুরু কুঁচকে তাকাল। "তার মানে? বাড়িটা কি ভেঙে গেছে?"
বৃদ্ধ হাতের লাঠি দিয়ে মাটিতে একটা দাগ কাটতে কাটতে বলল, "বাড়ি ভাঙলে তো ভালোই হতো বাবু। কিন্তু মাটি যদি বাড়িকে গিলে খায়? এই মাটি দেখছেন না? এ মাটি মরে গেছে। মৃত জিনিসের পেটে খিদে বড় বেশি।"
অনির্বাণের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছিল। একে এই বিদঘুটে গন্ধ, তার ওপর এই পাগলাটে বৃদ্ধের হেঁয়ালি। সে বিরক্ত হয়ে বলল, "আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না। আর এই গন্ধটা... কিসের গন্ধ এটা?"
বৃদ্ধ এবার চোখ তুলে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে এমন এক ঠান্ডা ভাব ছিল যা বিকেলের ভ্যাপসা গরমেও অনির্বাণকে কাঁপিয়ে দিল।
"গন্ধ? ওটা মাটির দীর্ঘশ্বাস বাবু। জ্যান্ত মানুষ যেমন দম আটকে গেলে ছটফট করে, এ মাটিও তেমন ছটফট করছে। শ্বাস নিতে পারছে না। তাই ভেতর থেকে পচা ভাপ বেরোচ্ছে। ফিরে যান। অন্ধকার নামলে এই বাতাস আর নিঃশ্বাস নেওয়ার যোগ্য থাকে না।"
কথাগুলো বলতে বলতে বৃদ্ধের গলাটা কেমন যেন যান্ত্রিক হয়ে গেল। অনির্বাণ যুক্তিবাদী মানুষ। কিন্তু এই নির্জন প্রান্তরে, এই অদ্ভুত দর্শন বৃদ্ধের মুখে ‘মাটির দীর্ঘশ্বাস’-এর কথা শুনে তার বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। তবু, সে অনেক দূর থেকে এসেছে। এভাবে ফিরে যাওয়া যায় না।
নিজেকে জোর করে সাহস জুগিয়ে অনির্বাণ বলল, "ভয় দেখাচ্ছেন কেন দাদু? আমি ফিরে যাওয়ার জন্য আসিনি। আমাকে যেতেই হবে।"
বৃদ্ধ আবার মাটির দিকে তাকাল। তার গলায় ঝরে পড়ল এক অমোঘ সত্য, "যেতে তো সবাই চায় বাবু... কিন্তু ফিরতে কজন পারে? যান... এগিয়ে যান। মাটি তো আপ্যায়ন করার জন্য মুখিয়েই আছে।"
বৃদ্ধ আর কোনো কথা বলল না। আবার সেই পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে গেল।
অনির্বাণ আর দাঁড়াল না। সে আবার হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু লাল মাটির পথটা যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। আর যতই সে এগোচ্ছে, সেই পচা গন্ধটা ততই তীব্র হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন বাতাসটা ভারী হয়ে চেপে বসছে তার ফুসফুসের ওপর।
হঠাৎ... পায়ের নিচের মাটিটা কি কেঁপে উঠল?
ভূমিকম্প নয়। অনির্বাণ থমকে দাঁড়িয়ে নিচু হয়ে দেখল। মাটির নিচ থেকে সরু সরু লালচে শিকড় বেরিয়ে আসছে... যেন অজস্র সাপের মতো কিলবিল করে নড়ছে সেগুলো। তারা যেন মাটির নিচ থেকে কিছু একটা খুঁজছে... বা কাউকে খুঁজছে।
"শিকড়গুলো... জ্যান্ত?" অনির্বাণের গলা দিয়ে আতঙ্কের স্বর বেরলো।
সে চোখ রগড়ে আবার তাকাল। শিকড়গুলো স্থির। চোখের ভুল? হয়তো। কিন্তু সেই জঘন্য গন্ধটা এখন অসহ্য। সামনে গ্রাম দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কোনো মানুষের সাড়া নেই। নেই কোনো সন্ধ্যাকালীন প্রদীপ। শুধু দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি পোড়োজমি আর সেই অভিশপ্ত লাল ফুলের জঙ্গল।
বাতাসে ভেসে এল এক অদ্ভুত শব্দ। অনেকটা শেয়ালের ডাকের মতো, কিন্তু তার সাথে মিশে আছে মানুষের হাহাকার... কিংবা কোনো অশরীরী অট্টহাসি। অনির্বাণ বুঝতে পারল, বৃদ্ধ ভুল বলেনি। এখানে শুধু মাটি মরেনি... এই মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে এমন কিছু অতীত... যা জাগাতে নেই।
শালবনীর মাটিতে পা তো দেওয়া হলো... কিন্তু ফেরা কি হবে? চৌধুরী বাড়ির সেই কঙ্কালসার অতীতে কী লুকিয়ে আছে? সেই উত্তর খুঁজতে অনির্বাণ পা বাড়াল অন্ধকারের দিকে।
(ক্রমশ)


Pratyahiki Vol4 | 23January 2026

Wednesday, 21 January 2026

Pratyahiki Vol3 | 22January2026

Wednesday, 2 July 2025

ভোরবেলা: আয়নার ভিতর আটকে থাকা সময়

> আমরা সাধারণত ভাবি, সময় চলে — একরৈখিক, ঘড়ির কাঁটার মতন।
> কিন্তু “ভোরবেলা: পুনরাবৃত্তি” গল্পটা লিখতে গিয়ে আমি বুঝলাম —
> **সময় অনেক সময় আটকে যায়। এবং কোথাও না কোথাও সেটা ঘুরে ফিরে আসে।**

এই গল্পটা আমার কাছে ভূতের গল্প নয়।
এটা একটা **“মেমোরি-লুপ”** — যেখানে কেউ একজন বাঁচার আগেই মরে গেছে,
আর মরে যাওয়ার পরেও তার অনুভূতিটুকু থেকে গেছে সময়ের গায়ে —
যেন দেওয়ালের মধ্যে গেঁথে থাকা এক গন্ধ, এক প্রতিচ্ছবি।

ঈশিতার চিঠি লিখে পাঠানোর ভিতর একধরনের আর্তি ছিল —
সে কাউকে চায়, যে শুনতে পাবে।
আর তরণ সেন, সেই শ্রোতা — যে ভয় পায় না, বরং অনুধাবন করে।

ঘড়ির কাঁটা ৩টা ৩৩ তে আটকে যাওয়া — এটা কেবল একটা সময় নয়,
**একটা পোর্টাল**।

যেখানে বাস্তব আর অভিজ্ঞতা মিশে গিয়ে একটা ধোঁয়াটে দেয়াল তৈরি করে,
যেটার একপাশে আমরা আছি, আর আরেক পাশে — তার মতো কেউ,
যে এখনো কথা বলতে চায়।

AahamVerse-এর এই Universe-কে আমি নাম দিয়েছি —
**Innerline**।
কারণ এটা surface-এর নিচের স্তর —
যেখানে **সময় শব্দ করে না, শুধু অনুভব করায়।**

---

## 🧭 Discussion Prompt:

আপনার মতে ঈশিতার ফ্ল্যাটে দেখা দেওয়া সেই ছায়াটি কি অপর্ণা-ই?
না কি সে শুধুই একটা প্রতিচ্ছবি, যা আমাদের ভিতরের ভয়কে প্রকাশ করে?





INNERLINE UNIVERSE: সময়ের নিচে, ছায়ার পেছনে একটা অন্য জগৎ

> **“সব গল্প ভয় পায় না। কিছু গল্প ভয় দেখায়। আর কিছু গল্প — ফিরে আসে।"**

আমরা যেটাকে **‘বাস্তব’** বলি, তার নিচে একটা আরেকটা স্তর আছে।
আলো আর ছায়ার মাঝখানে,
ঘুম আর জাগরণের সন্ধিক্ষণে,
অথবা আধ্যাত্মিক বিশ্বাস আর আধুনিক বিজ্ঞান — এই দুইয়ের ফাঁকে
জন্ম নেয় **INNERLINE**।

---

### 🧭 Innerline কী?

INNERLINE হলো একটি universe —
কিন্তু ঠিক সায়েন্স-ফিকশন, বা শুধুই ভূতের গল্প নয়।

এটা এমন একটা জগৎ যেখানে মিলেমিশে আছে:

🔮 **Paranormal** – যেমন ঈশিতার ফ্ল্যাটে প্রতিদিন ভোর ৩:৩৩-এ ফিরে আসা সেই অদ্ভুত প্রতিচ্ছবি।

🪷 **Mythic** – যেখানে পুরোনো পুরাণ আর লোকবিশ্বাস আধুনিক জীবনের ছায়ায় ঢুকে পড়ে,
আর কোনও ছায়া হয়ে উঠে পড়ে প্রশ্নের চেয়ে গভীর।

🌑 **Horror** – কিন্তু এই ভয় রক্তারক্তি নয়,
এই ভয় **স্মৃতির ভয়**, **অনুভবের ভয়**,
যেটা তোমাকে রাত ৩টা ৩৩-এ জাগিয়ে তোলে কারণ… *তুমি জানো কেউ আছে।*

---

### 👁️ এই Universe-এ কী পাওয়া যাবে?

* গল্প — প্রতিটা একেকটা ছায়া
* পুরনো লোককথার আধুনিক প্রতিফলন
* একাধিক চরিত্র — যারা নিজেরাও জানে না তারা কেন এখানে
* "তরণ সেন" — একমাত্র ব্যক্তি যে এসব গল্প শুনতে পায়
* একেকটা গল্প একেকটা "Trigger" থেকে শুরু হয় — যেমন টিনের হার, আয়না, পুরনো বাক্স বা কবিতার খাতা

---

### 🔍 ইতিমধ্যেই যে গল্পগুলো এসেছে:

1. **ভোরবেলা: পুনরাবৃত্তি** — সময় যেখানে আটকে গেছে ৩টা ৩৩-এ
2. **ভুতের কুটির** — ইংরেজ সাহেবের স্ত্রীর আর্তনাদ
3. **হস্তিচলের পুঁথি* — এক পুরোনো পুঁথিকে কেন্দ্র করে ভয়ের উদ্বেগ
4. **ডাইনি** — এক মহিলার মৃত্যুর পরেও তাকে আটকে রাখার গল্প

*(আরও ২টি গল্প তৈরি হচ্ছে, যার একটিতে mythic influence স্পষ্টভাবে থাকবে)*

---

### 🌌 এই Universe কার জন্য?

যারা ভূতকে কেবল ভয় নয়, **ভূতকে ভাষা মনে করে**
যারা পুরাণকে গল্প নয়, **জীবিত সংস্কৃতি** মনে করে
যারা Horror চায়, কিন্তু মনে রাখতে চায় — ভয় সবসময় গলা ফাটিয়ে আসে না,
কখনও সে নিঃশব্দ থাকে, **চোখে তাকায়**।

---

### 💡 Universe Tagline:

> *"ভয় সবসময় শব্দ করে না।
> কখনও কখনও, সে শুধু উপস্থিত থাকে।"*

---

### 📣 আপনি কী করতে পারেন?

* Universe-এর গল্পগুলো পড়তে পারেন
* গল্প শেষ হলে—আপনি চাইলে **আপনার নিজের অভিজ্ঞতাও পাঠাতে পারেন**
* Universe-এর প্রতিটা গল্পে একটা “trigger object” থাকে —
  দেখে নিন, হয়তো আপনার ঘরেও এমন কিছু আছে…

---

### 🔗 Social Tags:

`#INNERLINEUniverse` `#AahamVerseOriginals` `#MythicHorror` `#ParanormalBangla` `#ভয়_শুধু_ভয়ের_জন্য_নয়`

---

## ✍️ End Note:

এই Universe কেবল গল্পের না,
এটা একটা সময়চক্র।
যেখান থেকে কেউ কেউ ফিরে আসে।

তুমি প্রস্তুত তো?

**INNERLINE**
— *Just beneath the surface.*


👉 “AahamVerse Presents: INNERLINE — সময়ের নিচে ছায়ার গল্প”

Search This Blog

Powered by Blogger.

Ranga Matir Dirghosshas